‘নিয়ত করেও দশ বছরে স্ত্রীকে একটা শাড়ি দিতে পারিনি’

ওয়াকিল আহমেদ। দিনাজপুর রেলস্টেশন এরিয়াতে প্যাডেলচালিত রিকশা চালায়। প্রতিদিনের মতোই রেলস্টেশনের প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে আছে প্যাডেলচালিত কয়েকটি রিকশা। এর মধ্যে একটির সিটে বসে পায়ের ওপর পা তুলে অনেকটা আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আছেন রিকশাচালক ওয়াকিল আহমেদ।

তার মুখে খোঁচা দাঁড়ি, গায়ের চামড়া ঢিলে হয়ে লেপ্টে গেছে। মাঝেমধ্যে হেঁটে যাওয়া মানুষ দেখলে পা নামিয়ে গন্তব্যের কথা জিজ্ঞেস করছেন। উত্তর না পেয়ে চোখ ঘুরিয়ে লম্বা দৃষ্টি রাখছেন সড়কে হেঁটে আসা মানুষগুলোর দিকে।

নিজের বয়সের ব্যাপারে নিশ্চিত নন ওয়াকিল। তাঁর ধারণা, বয়স ৬৫-৭০ হবে। হাত–পায়ে ফুলে ওঠা শিরাগুলো জানান দিচ্ছে প্যাডেল মারার বয়সের কথা। ঠোঁটের কোনায় তবু উঁকি মারছে একচিলতে হাসির রেখা।

‘চাচা কী খবর? আছেন কেমন?’ বলতেই উত্তর, ‘হারা ফির কেমন থাকমো। খেয়া না খেয়া চলি যাছে দিন।’ ঈদে কী কিনেছেন, এমন প্রশ্ন শুনতেই যেন আকাশ থেকে পড়লেন ওয়াকিল। ঈদের বাজার!

‘সংসারের খরচ করির পারোছি না, আরও ঈদ।’ পাশেই বসে পড়লাম। ষাটোর্ধ্ব ওয়াকিল বলতে শুরু করলেন, ‘গত দশ বছরের বেশি সময় পার হই গেইসে তোমহার চাচিক একখান শাড়ি কিনি দিবার পারো নাই। প্রতিবারই নিয়ত করোছি কিন্তু নিয়ততো পুরা হচে নাই।’

ওয়াকিল আহমেদের বাড়ি দিনাজপুর শহরের চাতরা পাড়া এলাকায়। নিজের জমি নেই। সরকারি জমিতে টিন দিয়ে ঘর করে বসবাস করছেন। স্ত্রী নাসিমা বেগম শহরের বড় মাঠসংলগ্ন রাস্তার পাশে ইট ভাঙার কাজ করেন। ওয়াকিল-নাসিমা দম্পতির চার ছেলেমেয়ে। একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। বড় ছেলে বিবাহিত, কাজ করেন সেলুনে। মেজ ছেলে ট্রাক্টরের লেবার আর ছোট ছেলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে।

কত দিন থেকে রিকশা চালাচ্ছেন তা বলতে না পারলেও অনেক ছোট থেকেই রিকশা চালাচ্ছেন এমনটিই জানান। একটা সময় রিকশা চালিয়ে দৈনিক ৩০০-৩৫০ টাকা পর্যন্ত আয় করেছেন। বর্তমানে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা আয়।

ওয়াকিল জানান, মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে। প্যাডেল রিকশায় কেউ উঠতে চায় না। তা ছাড়া ইজিবাইকের ভিড়ে শহরে রিকশা চালানো কঠিন। রিকশার কাছে আসে কিন্তু শরীরের দিকে তাকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়।

সকালে রিকশা নিয়ে বের হন ওয়াকিল। স্টেশনের গেটে রিকশা স্ট্যান্ড করেন। হোটেলে গিয়ে ডাল-সবজি, দুই গ্লাস পানি, দুটি পরোটা চালান করে দেন পেটে। এরপর কেটে যায় সারা দিন। ক্ষুধা লাগলে মাঝখানে খাওয়া পড়ে চা-পাউরুটি। সূর্য ডুবলে দিনের আয় নিয়ে ছোটেন বাহাদুর বাজারে।

চাল-ডাল কিনে রওনা করেন বাড়ির দিকে। সব দিনই বাহাদুর বাজারে প্রবেশ করা হয় না ওয়াকিলের। যেদিন বাজার নিয়ে যাওয়া হয় না, সেদিন বউয়ের চোখরাঙানিও দেখতে হয়। ছোট ছেলের জন্য মায়া হয় ওয়াকিলের। ওয়াকিল বলেন, ছেলেটাকে এটা ওটা কিনে দিতে মন চায়। তবে সাধ থাকলেও সাধ্যে কুলায় না।

দুই ছেলে আয় করছেন। বড় ছেলের সংসার হয়েছে। স্বল্প আয়ে তাকেও চলতে হয়। মাঝেমধ্যে সংসারের খরচ দেন ছেলেরা। করোনাকালে কীভাবে চলেছেন শুনতেই ওয়াকিলের উত্তর, ‘ওই দিনগিলার কথা বলেন না বাপ। কাম কামাই নাই।

পৌরসভা থাকি ১০ কেজি চাল পাইছিনো। কষ্ট কী জিনিস, চোখে দেখোছি।’ উল্টো প্রশ্ন ছোড়েন ওয়াকিল, ‘এলাও কি ভালো আছি। দশ টাকা কেজির চাল হই গেইসে ৪০-৫০ টাকা। ডাল-সবজি দিয়েই তো ভাত খাই। ওইগিলার দামও চড়া।’

এখন থেকে এক দশক আগেও দিনাজপুর শহরের সড়কগুলো ছিল প্যাডেলচালিত রিকশার দখলে। সময় বদলেছে। প্রযুক্তির উন্নয়নে সেই সড়ক দখলে নিয়েছে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক। দিনাজপুর পৌর কর্তৃপক্ষসহ কয়েকজন রিকশাচালক জানান, আড়াই-তিন হাজার রিকশা ছিল দিনাজপুরে। =

২০০৯ সালের দিকে প্রথম ইজিবাইক আসে। খুব কম সময়ের মধ্যে প্যাডেলচালিত রিকশাগুলো গ্যারেজে থিতু হলো। তারপর ভাঙারির দোকানে বিক্রি হতে শুরু হলো। তবে এখনো ওয়াকিলের মতো জন দশেক আছেন, যাঁরা প্যাডেলচালিত রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

ভাড়ায় নিয়ে ইজিবাইক চালানোর আলোচনায় ওয়াকিল বলেন, ‘হাত–পা কাঁপে। ওটা চালানো কঠিন হই যায়। আর বাঁচমো কয় দিন। এই রিকশাই চালামো।’ মাঝেমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন ওয়াকিল। কিন্তু বসে থাকার উপায় নেই। অসুস্থ থাকলেও রিকশা নিয়ে বের হতে হয় তাকে।

জানালেন, স্ত্রী বয়স্ক ভাতার কার্ডের জন্য পৌরসভায় যোগাযোগ করেছেন। এখনো পাননি। আর কথা বাড়াতে চান না ওয়াকিল। নেমে পড়লেন রিকশা থেকে। মৃদুভাবে প্যাডেলে চাপ দিয়ে ছুটলেন স্টেশনের ফটক থেকে গণেশতলার দিকে। অন্যান্য যানবাহনের ভিড়ে অদৃশ্য হলো ওয়াকিলের রিকশার ঘূর্ণমান চাকা। সূত্র: প্রথম আলো

About admin

Check Also

স্যার আমি আস্তে করি, চেষ্টা করি যেন বেশি ব্যথা না পায়

ক্লাস রুটিন আর পরীক্ষার রুটিনের বাইরে ভিন্ন রকম এক রুটিন চালু করেছে রাঙ্গুনিয়ার এক কওমি …

Leave a Reply

Your email address will not be published.